বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৩

কবি জয়িতা ভট্টাচার্য'র "হয়ে ওঠা"

 কবি জয়িতা ভট্টাচার্যের ‘হয়ে ওঠা’ : মলয় রায়চৌধুরী

পত্র-পত্রিকায় দেখি জনপ্রিয় ও মঞ্চসফল পুরুষ কবিদের তুলনায় মহিলা কবিদের আলোচনা প্রায় হয় না । রাজলক্ষ্মী দেবী, কবিতা সিংহ, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, মিতুল দত্ত,  শতরূপা সান্যাল কবিতায় বাঁকবদল ঘটিয়েছেন অথচ তাঁরা তেমন আলোচিত নন । মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা আলোচনা হয় তার কারণ তাঁর স্বামী সাহিত্যের পীঠস্হানের পদাধিকারী। জানি না পঞ্চাশ বছর পর কী হবে । পুরুষ কবি-লেখকদের ‘হয়ে ওঠা’ নিয়ে আলোচকরা ভাবেন অথচ নারী কবি-লেখকদের ‘হয়ে ওঠা’ নিয়ে চিন্তা করেন না।

পুরুষ কবি ও লেখকদের ‘হয়ে ওঠা’ নিয়ে নানা আলোচনা পড়ার সুযোগ হয়েছে,  কোনও পুরুষ লেখক বা কবির গ্রন্হে তাঁর ‘হয়ে ওঠা’ বর্ণিত হয়েছে তা পড়েছি ইংরেজিতে, কেননা তাঁরা ইউরোপিয় সাহিত্যিক, এবং এই ‘হয়ে ওঠা’ ব্যাপারটির তত্ব তাঁদেরই গড়া । সাহিত্যিক নিজেই যদি লেখেন তাহলে তা বিলডুংসরোমান ( Bildungsroman )-এর সাবাজনার কুন্সটলরোমান  ( Kunstlerroman ) অথবা ‘শিল্পীর নিজস্ব ন্যারেটিভ’ হিসাবে চিহ্ণিত হয়েছে । অন্যের লেখা হলে তা বিলডুংসরোমান । 

আমি এই প্রবন্ধে জয়িতা ভট্টাচার্যের ‘হয়ে ওঠা’ নিয়ে লিখছি । তিনি বহুকাল যাবত লিখছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, কলকাতা ও তার বাইরে অনুষ্ঠানগুলোতে কবিতা পাঠ করেছেন । ‘বর্ণমালার সাতকাহন’ নামে একটা আত্মজৈবনিক উপন্যাসে সবকিছু খোলাখুলি লিখেছেন যা সচরাচর বাঙালি মহিলা কবি-লেখকদের করতে দেখা যায় না । কবি জয়িতা ভট্টাচার্যর এই গ্রন্হের ন্যারেটিভ ওই দ্বিতীয় বর্গে পড়ে, যদিও তা কেবল ‘হয়ে ওঠা’য় সীমাবদ্ধ নয় । কিন্তু, এখানে একটা ‘কিন্তু’ আছে, তা এই যে জয়িতা বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে, ইউরোপিয় পরিবারে প্রতিপালিত মেমযুবতী নন । তাঁর ‘হয়ে ওঠা’র সঙ্গে এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিঙের ‘অরোরা লেই’, মারিয়া বেনেডিটা বোরম্যানের ‘লেসবিয়া’, প্যাট্রিসিয়া হাই স্মিথের ‘দি প্রাইস অফ সল্ট’, অ্যালিস মুনরোর ‘লাইভস অফ গার্লস অ্যাণ্ড উওমেন’, মার্গারেট লরেন্সের ‘দি ডিভাইনার্স’, মার্গারেট অ্যাটউডের ‘ক্যাটস আই’, জেনিফার ডোনেলির ‘এ নর্দার্ন লাইট’ বইগুলোর তুলনা করা ভুল হবে । তার কারণ তাঁরা লড়েছেন মূলত সমাজের চাপিয়ে দেয়া সেই মূল্যবোধের সঙ্গে যা নারীর পক্ষে অস্বস্তিকর এবং একজন মহিলা কবি-লেখককে লেখার স্বাধীনতা বা বেঁচে থাকার স্বাধীনতা তেমনভাবে দেয় না, ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’ দেয় না, যা একজন পুরুষকে দেয় । জয়িতা লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে শৈশব থেকেই অবদমিত করার কারসাজি শুরু হয়ে যায়। কারণ, "কেন" এই একটা প্রশ্ন টলিয়ে দিতে পারে অনেককিছু, একটা সমাজ, একটা সংসার বা একটা সম্পর্ক।’  অন্যান্য সব সাহিত্যের মতো বাংলা-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও বাঙালি পুরুষ, সব জাতির পুরুষের মতোই, নারীসাহিত্যকে অনুমোদন করার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে, নারীকে দেখেছেন রান্নাবান্না বা সংসারের-সেবাদাসীরূপে; নারী-লেখকদের মধ্যেও তারা খুঁজেছেন আদর্শ স্ত্রীকে। নারী-লেখক বা তাঁর লেখা এক্ষেত্রে মূল্যবান নয়। পুরুষের কাছে তাই নারীসাহিত্যের কোনও ইতিহাস আজও লেখা হয়নি, তাঁদের প্রতিভার প্রকৃত বিচার ও মূল্যায়ন হয়নি, এমনকী তাঁদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ তথ্যও বেশ দুষ্প্রাপ্য। স্বর্ণকুমারী দেবী, অনুরূপা দেবী, নিরুপমা দেবী, শৈলবালা ঘোষজায়া, সীতা দেবী, শান্ত দেবী ও আরও অনেক লেখিকার সব বইয়ের নামও খুঁজে পাওয়া যায় না। খুঁজে পাওয়া যায় না তাঁদের বইয়ের প্রকাশের তারিখ। এই তথ্য বাংলা সাহিত্য-সমাজে অত্যন্ত লজ্জার। তাঁরা শিকার হয়েছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের উপেক্ষার। পুরুষ-সমালোচকেরা ধরেই নিয়েছিলেন তাঁদের সাহিত্য অপাঠ্য, বিশেষ করে যাঁদের বই জনপ্রিয় হয়েছিল তাঁরাও সম্পূর্ণ অপাঠ্য, এমন একটি ধারণাও প্রচলিত ছিল যার রেশ পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি।

জুন ১৯৯০ সালে জয়িতা বিয়ে করেন ; উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়নি তখনও।তারপর এম.কম, ইংরেজিতে এম.এ, কমপিটার সফ্টওয়ার অ্যানালিসিস। পড়াশোনা শেষে সরকারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরির একবছর পর মেয়ে, ২০০১ সালে। তার দুবছর পর মৃত কন্যা। ২০০৬ সালে ছেলে ।  জয়িতা ভট্টাচার্যকে প্রথম থেকেই লড়তে হয়েছে দশভূজার মতন, বা হয়তো আরও বেশি হাতে, এবং তিনি পা-ও চালিয়ে থাকতে পারেন । ‘বর্ণমালার সাতকাহন’ বইটি পড়লে পাঠক বুঝতে পারবেন যে তাঁর লড়াই এখনও শেষ হয়নি । সাহিত্যের জগতে জয়িতার প্রবেশ, কৈশোর-তারুণ্যের  বাধানিষেধের বিরুদ্ধে, ব্যক্তিগত এক কনটেমপ্লেশান, নিজের অন্তর্জগতের অভিপ্রায়, আবেগ ও আকুল কামনার সঙ্গে পরিচিত হবার উদ্দেশ্যে । ‘বর্ণমালার সাতকাহন’ আত্মজৈবনিক উপন্যাস। চারটি কবিতার বই আছে তাঁর, ‘নিঃশব্দ শিশির হৃদয়’, ‘সন্ত্রাসকে ভালোবেসে’, ‘শিখিপাখা ও শাইলক’ এবং ‘নাভি ভরে থাকে বিষ’ । গল্পগ্রন্হ একটি, ‘পাঠক্রমে নেই’ । অনুবাদ করেছেন লোরকা, মায়া এঞ্জেলু, নাদিয়া আঞ্জুমান, সিলভিয়া প্লাথ, গিরিজা প্রসাদ মাথুর, বিশ্বনাথ তেওয়ারি প্রমুখের কবিতা । জয়িতা কুন্ঠাবোধ করেন বহুল প্রচারিত পত্র-পত্রিকার ক্ষমতাবান সম্পাদকদের এবং সরকারি পীঠস্হানের কর্তাদের তোয়াজ করতে, যা না করলে যুবক কবি-লেখকরাও বিশেষ পাত্তা পান না ।

জয়িতা ভট্টাচার্য বিষয়কে কবিতার কেন্দ্রে রাখেন না । কবিতার কেন্দ্র থেকে তত্ত্ব এবং তর্ককে সরিয়ে দিয়ে তিনি  দাপটের সঙ্গে  বাংলা কবিতায় এনেছেন নারীর উত্তর-আধুনিকতা ।  এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটি করে জয়িতা বাংলা কবিতাকে অনেকখানি আন্তর্জাতিক করতে পেরেছেন। তাঁর অন্তর্ঘাতী, ক্যাননভঙ্গকারী, সৃজনশীল কবিতাগুলো যা ধরার প্রয়াস করেছে  তা হল “মানবেতিহসের প্রেক্ষিতে এই মুহূর্তের সংঘর্ষময় নবাঞ্চল”। জয়িতার ইতিহাসবোধ কেবল সময়কেন্দ্রিক নয় । তাঁর ‘বর্ণমালার সাতকাহন’ বইতে  জ্ঞানের বিকাশে অভিজ্ঞতার ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন, রৈখিক সময়ের একটিমাত্র ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, বস্তুত ‘সময়বোধ’-এ বিপ্লব আনতে চেয়েছেন, এবং  সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংঘর্ষময় জায়গাটাকে ভরে তুলতে চেয়েছেন নবাঞ্চলের ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতা দিয়ে, অভেদের সন্ধান দিয়ে  ।

ভারতীয় উপমহাদেশে, পরিবারে কন্যাসন্তান কেউ সাধারণত চান না, আর প্রথম সন্তান কন্যা হলে পাড়া-পড়শিরাও যেচে বাড়ি এসে হাহুতাশ বিলিয়ে যান । জয়িতার পরিবারে সবায়ের আশা ছিল ছেলে হবে । হল না । জয়িতার যখন ভাই হল, তখন তাঁদের চাহিদা পূরণ হলো । কিন্তু ছেলে হবার দরুন জয়িতার আদরযত্নের খেয়াল রাখার প্রয়োজন মনে করলেন না তাঁরা । পরিবারে যে একটা স্পেস বা পরিসরের প্রয়োজন হয়, মেয়েদের বিশেষ করে, তাকে গুরুত্ব দিতে চান না ভারতীয় উপমহাদেশের বয়স্ক আত্মীয়-স্বজনরা । আমার মনে হয়, যাঁরা লেখালিখি করেন , তাঁদের মস্তিষ্কে একটি স্ট্রিম অফ কনশাসনেস বইতে থাকে, নানা খাতে বইতে থাকে । জয়িতাকে তো কেউ প্রশ্রয় দেননি লেখালিখির, তবু তাঁর মনে হয়েছে যে মগজের ভেতরে যে চেতনার ধারা বহমান তাকে প্রকাশ করা প্রয়োজন । কবিতার নীল বিষ গলায় ধরে রাখা আরম্ভ করলেন । সাহিত্যে নারী লেখকদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়। এ প্রথা সর্বকালের এবং সর্বযুগের। ইংরেজি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায় মূলত পুরুষদের দ্বারা সাহিত্য নিয়ন্ত্রিত। কখনো কখনো নারী লেখকদের লেখাকে বিভিন্ন সাহিত্যে অবমূল্যায়নও করা হয়ে থাকে।

 তিনি স্কুলে ভর্তি হলেন, কৈশোরে পৌঁছে টের পেলেন যে অযাচিত রোমিওদের মোকাবিলা করতে হবে তাঁকে, এই ধরণের অভিজ্ঞতা সচরাচর কিশোরদের হয় না । মেয়েদের কৈশোর পেরোবার পর বাড়িরে বাইরে একটা ভিন্ন জগত গড়ে উঠতে থাকে, আর যেমন-যেমন কিশোরীটি যৌবনের দিকে এগোন, তাঁর সমস্যা বাড়ে । বাড়ির বয়স্ক মহিলারা, কিশোরীকে বলেন না যে তার বয়স হয়েছে, একদিন যোনি থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে পারে, এবং তা প্রতিমাসে হবে, তাকে স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধতে হবে । কৈশোরে প্রথম রক্তের অভিজ্ঞতা এবং পিরিয়ডজনিত শারীরিক কষ্ট তার জীবনে একটি জলবিভাজক । এখনকার কিশোরীদের, টিভির বিজ্ঞাপন ও বন্ধুদের অভিজ্ঞতার দরুন, ব্যাপারটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবার সুযোগ হয়, যা জয়িতার সময়ে ছিল না ।

 স্বাভাবিকভাবে মন ও দেহ প্রেমের ডাক জাগায়, মস্তিষ্ক ডাক দেয় কবিতার দিকে, সামাজিক বিপ্লবের দিকে । জয়িতা কবিতা লেখা আরম্ভ করেন ; তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয় বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে । তিনি বামপন্হী ‘পার্টি করা’ আরম্ভ করেন । তিনি  প্রেমে পড়েন । প্রেমে পড়লে যেমন হয়, জয়িতা প্রেমিককে বিশ্বাস করে বিয়ে করার পর জানতে পারেন যে স্বামী কোনো চাকরি-বাকরি করেন না, তাঁর বিদ্যায়তনিক শিক্ষা নেই, অর্থাৎ চাকরির বাজারে তিনি অচল । শশুরবাড়ি গিয়ে, অতএব, সংসার সামলাবার আর্থিক দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে হলো জয়িতাকে । বাড়ির বিরক্তিকর ভাড়াটে তোলার দায়ও তাঁর ওপর বর্তালো, বহু পুরোনো বাড়ি সারাবার দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তালো ।

 ভাগ্যক্রমেই বলতে হবে, তিনি একটি  সরকারি স্কুলে শিক্ষিকার চাকরি পান । তিনি সন্তানসম্ভবা হয়ে ওঠেন।  তাঁরও প্রথম সন্তান একটি মেয়ে, যার দরুন মা ও মেয়েকে একই সঙ্গে খোঁটা খেতে হয় । প্রথম দিকে শিশুকে কোলে নিয়ে চাকরি করতে যেতেন । পরে তাকে বাড়িতে রেখে আসতেন; বুকে বাড়তি দুধ হবার ফলে প্রতিদিন স্কুলের টয়লেটে গিয়ে দুধ গেলে ফেলে দিতে হতো, এবং শিশুটির জন্য লুকিয়ে কেঁদে নিতে হতো । এইটুকু সময়ের মধ্যে কতোকিছু হয়ে উঠলেন তিনি– কবি, প্রেমিকা, স্ত্রী, রাঁধুনি, শিক্ষিকা, মা, বউমা, সংসারের আর্থিক মেরুদণ্ড, ভাড়াটেদের নিয়ন্ত্রক !

 মনের ভেতরের প্রবাহ তো থামে না, তা অভিজ্ঞতার প্রহারের সঙ্গে ঢেউয়ের আছাড় মেরে এগিয়ে নিয়ে যায় পরবর্তী সংঘাতের দিকে । জয়িতার শশুর আক্রান্ত হলেন ব্রেন টিউমারে এবং শাশুড়ি  আক্রান্ত হলেন ক্যানসারে, এবং জয়িতার সেবার দায়িত্ব বাড়ল । সংসারের চাপে তাঁর লেখালিখি ছেড়ে গেল, কফিহাউসে যাওয়া, কবিদের সঙ্গে সময় কাটানো, নতুন কবিতা কেমন লেখা হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা করা বন্ধ হয়ে গেল । ‘পার্টি করা’ থেকে তিনি নিজেই বেরিয়ে এলেন যখন চোখের সামনে দেখলেন যে তথাকথিত নেতারা নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন, সাধারণ মানুষের জন্য কিছুই করছেন না । জয়িতার ঘরের দেওয়ালে ধুলোর আড়ালে ঝুলে রইলেন চে গ্বেভারা । যাপন ও প্রেম সম্পর্কে মোহমুক্তি তাঁকে বার-বার টেনে নিয়ে গেছে লেখালিখির দিকে, যার জন্য তাঁর পক্ষে ‘সময় বের করে নেয়া’ ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে  পুরুষদের পক্ষে এই ‘সময় বের করে নেয়া’ অতোটা কঠিন নয় । 

জয়িতাকে একজন লেখিকা ও মানবী হিসাবে  আবিষ্কার করতে এবং খুঁজে পাবার প্রয়াস করতে হয়েছে আত্মপ্রকাশের নিয়মনিষ্ঠ প্রণালী । জয়িতা তাঁর কবিতায় ও আত্মজীবনীমূলক ন্যারেটিভে  অবজেকটিভ লেখিকা হিসাবে তাঁর নৈতিক লড়াইকে প্রতিফলিত করতে চেয়েছেন, নিজেকে প্রশ্ন করেছেন তাঁর নির্ণয়গুলো সম্পর্কে, কেননা তাঁর অন্তরজগতের বিক্ষোভ, চাঞ্চল্য, কলরোলগুলোই পরিচালিত করেছে তাঁর পাঠবস্তুকে।  যেন মনে হয় টেক্সটের প্রট্যাগনিস্ট এমন স্হিতিতে রয়েছেন যা তাঁকে গণ্ডির বাইরে বেরোতে দিচ্ছে না । জয়িতার শুরুর দিকের, এমনকি এখনকার কবিতা পড়লেও একজন নারীর এই অনুপ্রাণন পাওয়া যাবে । লেখালিখির জগতে প্রবেশ করে ডাঁটিয়াল ও প্রাতিষ্ঠানিক পুরুষ র‌্যাম্বো-সম্পাদকদের হুমকি সামলাতে হয় জয়িতাকে, যাঁরা, জয়িতার কবিতা বা গদ্য তাঁদের পত্রিকায় প্রকাশ করার পর বলেন, “যা, পাতিরাম থেকে কিনে নে”। বলা বাহুল্য যে ‘দামিনী : মহিলা কবিদের বাংলা কবিতার সংকলন ১৪০০-২০০০’ ( সম্পাদনা : নমিতা চৌধুরী ও অনিন্দিতা বসু সান্যাল ।প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ২০১৩, নান্দীমুখ সংসদ) গ্রন্হে জয়িতা ভট্টাচার্য অন্তর্ভুক্ত নন। এই সংকলনে বিংশ শতাব্দীর মহিলা কবিদের তালিকা বিশাল, ২১১ জন কবি রয়েছেন এখানে। এই সময়ের শেষপর্ব সম্পাদকদের সময়ের অন্তর্গত। কবি নির্বাচনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকর। অনেক কবির ভিড়ে বেশ কিছু কবি যাঁরা বাঁকবদল ঘটিয়েছেন, তাঁরা অমনোযোগে বাদ পড়েছেন।

 ওপরে যে বিদেশিনি লেখিকাদের প্রসঙ্গ তুলেছি, তাঁদের কয়েকজনের মতন জয়িতার জীবনেও শৈশব থেকেই লেখন-প্রক্রিয়ার দিগন্তকে বাঙালি গেরস্তবাড়ির নিয়মনীতি দিয়ে একটা ঘেরাটোপে বেঁধে ফেলার সীমারেখা গড়ে দিয়েছিল, আশেপাশের লোকজনরাও সেই রেখাকে স্হায়ী করার প্রয়াস যে করেননি তা বলা যাবে না । এই বাঁধনকে জয়িতা অস্বীকার করেছেন উইল পাওয়ারের মাধ্যমে, এই উইল পাওয়ার প্রকৃতপক্ষে নিজস্ব পরিসরে স্হান তৈরি করার কৌশল, নিজের উৎসভূমি থেকে বেশ দূরে, যেখানে নিজের স্বপ্ন এবং কাঙ্খিত বৃত্তিকে সাফল্য প্রদান করা যায় । তাঁর  গল্প ও কবিতাগুলো সেই সাফল্যের খতিয়ান ।








মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৩

অপ্রকাশিত ছোটগল্প : মলয় রায়চৌধুরী

 অপ্রকাশিত ছোটগল্প : মলয় রায়চৌধুরী


—কী রে! দরজা খুলে আমাকে দেখেই তোর মুখ অমন গোমড়া হয়ে গেল? আমি তো থাকতেও আসিনি, খেতেও আসিনি. জাস্ট গ্যাঁজাব বলে এলুম, আর কোথায়ই বা যাই বুড়ো বয়সে, বল, সত্তর বছর হতে চলল…. রমেন তো মেয়ের বিয়ে দেবার পর বাড়িটা এমন আধ-খ্যাঁচড়া করে রেখেছে যে ওর বাড়িতে বসার জায়গা নেই, নেপাল ব্যাটা এই বুড়ো বয়সেও বউয়ের অনুমতি ছাড়া কাউকে বাড়িতে অ্যালাউ করে না, আর অনিমেষ সারাদিন পুজোর ঘরে….

—আরে তোকে দেখে গোমড়া হইনি রে… বয়সের সঙ্গে মুখটাই এমন আদল নিচ্ছে… চল, বিছানায় রোদে বসবি…ঘরটা অবশ্য মাকড়সাদের ব্যাবিলন হয়ে আছে…

—তোর ওপরতলার ধাপ্পাচারী টাকলাটা তো টেঁসেছে… সেই যেটা তোর বিরুদ্ধে পুরসভায় কমপ্লেন ঠুকে-ঠুকে তোর বাড়ির ট্যাক্স বাড়িয়ে দিলে…

—হ্যাঁ… লাশ নাবাবার সময়ে মুখ থেকে নকল দাঁতের পাটি সিঁড়িতে ছিটকে পড়ল… শবযত্রীরা কড়র-মড়র করে মাড়িয়ে নেবে গেল…সিঁড়িটা তো এজমালি…সে-সব কুচোনো দাঁত মাসখানেক অব্দি পড়েছিল সিঁড়িময়… তারপর একদিন ওই টাকলাটারই পোষা কুকুরটা ছাড়া পেয়ে কুঁইকুঁই কান্না সহযোগে চেটেপুটে সাফ করেদিয়েছিল সে-সব…মরার দিন টাকলাটা নাকি নোনা ইলিশ খেয়েছিল… তুই ওখানটায় বস… রোদ্দুরটা আবার লোক দেখলেই সরে যায়…

—ওহ, তার মানে সাফল্যের অম্ল-পিত্ত-কফে শেষ পর্যায়ে গোমড়াই হতে হচ্ছে… আমার তো আবার জন্মাবার সময়ে পা প্রথমে বেরিয়েছিল বলে মুখটা তেমন ভাল নয়… প্রেমে পড়েও সফল হতে পারিনি, এমন থ্রি বাই ফোর মোঙ্গোলিয়ান কাট মুখ… তার সঙ্গে আবার মিশেছে বয়েসকালের ডায়াবিটিসের তিতকুটে কথাবার্তা… এ একেবারে মেছুনির মাছিসঙ্গ, বুঝলি… এই বুড়োনো… মেয়েমানুষ ছাড়াই লিঙ্গ অকারণে দাঁড়িয়ে যায়… হয়তো প্রসটেটের সিগনাল… তা তুই এমন পেঁচিয়ে আছিস কেন…

—না রে, রতন বিশ্বাস নামে এক সম্পাদক ওনার আহবকাল নামের পত্রিকার জন্যে একটা অপ্রকাশিত ছোটগল্প চেয়েছেন… অথচ মাথার ভেতর গল্প নেই… ভেবেই পাচ্ছি না কিছু…

—আরে এতে আবার ভাবাভাবির কী আছে? আজকাল আবার কেউ গল্প পড়ে নাকি? টিভিতে দেখে নিল, ব্যাস, হয়ে গেল… সাহিত্য বলতে ভাষার কাজ তো আর বোঝায় না… সে-সব তো বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, বিভুতিভূষণের সঙ্গে চুকে গেছে… ঝেঁপে দে কিছু একটা ঘতনা… চেনা-জানে ঘটনা নিয়ে বেরিয়ে পড়… ছোট করে লেখ…

কিন্তু ঘটনা যে পাচ্ছি না…

—তোর জানলা দিয়ে পুকুর পাড়ের দৃশ্যটঅ দারুণ… দিশি মদের নিষ্পাপ স্বচ্ছতা… হ্যাঃ হ্যাঃ, পুকুরটার টলটলে আলো দেখে কাব্যি করার মুড হল… আররে… ও কী রে … তোদের পাঁচিলের দিকেই মুখ করেই তো সব মুততে বসছে চানে যাবার আগে… ওহ, দাঁড়িয়েও মুছে যে রে… দেখে তো মনে হচ্ছে সাবলটার্ন লিঙ্গ… এতো রকমের কালো শেডের লিঙ্গ… মাপও আলাদা-আলাদা মনে হচ্ছে… এ নিয়ে গভীর গবেষণা হতে পারে… রণজিৎ গুহর ম্যাগনাম ওপাসটায় আছে কী…অ্যাঁ?

—হ্যাঁ, বর্ষায় ঝোপঝাড়ে সবুজ এলেই দেখি মোতবার ঝোকটা একটু বাড়ে… প্রকৃতির সঙ্গে ট্রাইবাল একাত্মতা বোধহয়…

—সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশাল সায়েন্সেসে খবর দিতে পারতিস… লুফে নেবে… যা একখানা সাবজেক্ট… সাবজেক্ট আবার নিজেই অবজেক্ট…

—যার লিঙ্গ সে কেন লোফালুফি করতে দেবে…

—তাও হক কথা…এত সংবেদনশীল বিষয়…

—তাছাড়া কেবল লিঙ্গ নিয়ে হলে নারীবাদীরা চটে যাবেন… ওনারা বলবেন যোনি কেন বাদ গেছে…

—তা ঠিক, তবে নারীবাদ ব্যাপারটা আজকাল কেমন যেন হেদিয়ে এসেছে… লেখালিখি-সেমিনার কিছুই তো দেখি না…

—তার ওপর হিন্দু-মুসলমান লিঙ্গ ভেদাভেদ না করতে পারলে মহা হ্যাঙ্গাম… একদিকে সেকুলারিস্টরা চটবে, আরেকদিকে মৌলবাদীরা…

—আমার মনে হয় হিসির সঙ্গে বেরোনো ছুটকো-ছাটকা স্পার্ম থেকে পাঁচিলের ধারের রেড়ি-গাছগুলো হয়েছে…রেড়িফলগুলোর সাইজ দ্যাখ… কতো ভ্যারায়টি…

—হতে পারে, বলা যায় না, মহাভারতে আছে…

—মহাভারতের পৌরাণিক স্পার্ম আর আজকের দিনে কোথায়… সে-সব ছিল সুপারস্পার্মের যুগ… এখন তুই খন্ডিত ভারতের খন্ডস্পার্ম পাবি…

—তুষারচাপা অর্জুনের শব হয়তো পাওয়া যেতে পারে মহাপ্রস্হানের গ্লেসিয়ারে… বডি-সেল থেকে একটা অর্জুনক্লোন… একজন জুরাসিক অর্জুনের খুবই দরকার…

—আমার মনে হয় রামায়ণ-মহাভারতের লোকেরা এভাবে প্রাসাদের পাঁচিলের ধারে মুতে-মুতে রেড়িগাছ ফলাত না…

—কে জানে… ঠিক বলতে পারছি না… সংস্কৃত ভার্শানগুলো পড়িনি…

—তবে সঙ্গমকে নৈর্ব্যক্তিক করার দক্ষতা ছিল ওনাদের…

—তা হবে না কেন? তখনকার দিনে পোশাকের খোসাছাড়ানো যৌনকর্মী ছিল না…

—অন্ধকার খুলে ফেলে আলোর নগ্নতা পরে নিত…

—এখন তো মিনিটকতকে দুর্গাটুনটুনির উড়ন্ত কাঁপন… ব্যাপারটা বর্ণনা করতে হলে যতটা সময় দরকার তার আগেই কাজ খাল্লাস…

—যাকগে, ফালতু কথা ছাড়… রতন বিশ্বাসকে দেবার মতন গল্প লেখার আইডিয়া দে…

—তোর আবার গল্পের অভাব কিসের… পঁয়ষট্টি বছর হিল্লিদিল্লি করে কত কেলো তো করলি… সে-সব থেকে এক খাপচা লেখ… কিংবা তুই দুলালকান্ডটা লেখ না… সেই যে…

—কে দুলাল? আমাদের ক্লাসে যে সংস্কৃত টিচারের মেয়েকে নিয়ে আজমেরশরিফ না বিহারশরিফ কোথায় পালিয়েছিল…

—মেয়ে নয়… দুলালকে নিয়ে ইলোপ করেছিল সংস্কৃতস্যারের বউ… আজমের নয়, ওরা পালিয়েছিল বৃন্দাবন… দুলাল আমাদের ক্লাসে ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেত বলে একদিন ইস্কুলের গেট থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল… দুলালের ইংরেজি স্পার্মকে নিজের বাংলা ওভামের সঙ্গে মেলাবার জন্যে… দু-বেলা একসপ্তাহ যাবত মিলিয়েও কিছু হয়নি… দুলাল সংস্কৃতস্যার আর ওর বউ তিনজনেই ছিল বাঁজা… বাঁজাদের মজা বড়ই গলদঘর্ম ট্র্যাডেজি… কিন্তু আমি ওই দুলালের কথা বলছি না… আমি বলছি দমদমের কমরেড দুলালের কথা, যে তোলা আদায় করতে গিয়ে দুজনকে পিটিয়ে ইউটোপিয়ায় পাঠিয়ে দিলে… অবশ্য ওটা সাব জুডিস, কেস চলছে… তার চেয়ে তুই কেশপুর-গড়বেতার ঘটনা নিয়ে লেখ… ওখানে আগুনে পুড়িয়ে ইউটোপিয়ায় পাঠিয়েছে…. ক্লাইম্যাক্স দিতে পারবি… হুইপ ক্র্যাক এনডিং… ইংরেজি স্যার বলতেন শর্টস্টোরিতে ওই লজিকাল ক্লিক-শাট জরুরি…

—কিন্তু ওসব ঘটনা তো অলরেডি ঘটে গেছে…

—ঘতলেই বা…

—তুই বুঝতে পারছিস না… রতন বিশ্বাস একটা অপ্রকাশিত ছোটগল্প চেয়েছে…অপ্রকাশিত বুঝতে পারলি?

—কিন্তু কেশপুর-গড়বেতা বা দমদম-দুলাল নিয়ে কেউ এখনও গল্প লেখেনি… কারোর পোঁদে দম নেই লেখার… তুই লেখ না একটা…

—যে ঘটনা ঘটে গেছে তা তো অলরেডি প্রকাশিত… আমায় একটা অপ্রকাশিত লেখা দিতে হবে…

—বুঝলুম না ঠিক…

—যা প্রকাশিত নয়… মানে যা প্রকাশিত হয়নি, তাই অপ্রকাশিত…

কিন্তু তুই লিখেছিস নাকি? কেউই তো লেখেনি…

—না লিখিনি…

—তবে? লিখবি, ছাপা হবে, তবে তো তাকে অপ্রকাশিত বলা হবে…

—তা কী করে হয়… ঘটনা ঘটে গেছে… কাগজে বেরিয়ে গেছে… লোকে জেনে ফেলেছে…

—ওওও, তুই বলতে চাইছিস যে যা কোথাও বেরোয়নি অথচ ঘটে গেছে…

—না না, ঘটে গিয়ে থাকলে তো হয়েই গেছে… ঘটে গিয়েছে মানে তো প্রকাশিত হয়ে গেছে… আমায় অপ্রকাশিত লেখা দিতে হবে…

—তুই বলতে চাইছিস যে, যা ঘটেনি কিন্তু তুই তাকে ঘটাতে চাস… অথচ ঘটিয়ে ফেললে তা প্রকাশিত হয়ে যাবে… এবার বুঝেছি… কিছু না বলে সব-কিছু বলে দিতে হবে… ওফ, অপ্রকাশিত ছোটগল্প লেখা কম ঝকমারি নয় দেখছি…

—বুঝলি তো? যা ঘটেনি তা ঘটানো চলবে না…

—নাঃ…সত্যিই কঠিন ব্যাপার…

—তাই তো চিন্তায় আছি… রতন বিশ্বাস কাল টেলিফোন করেছিল…

—তুই আমাকে টেংরির সুপ আর চিকেন ভর্তা খাওয়াচ্ছিস, এরকম একটা লেখা লেখ… তুই খাওয়াবি না, ফলে ঘটনা ঘটবে না…

—কিন্তু আমি লিখে ফেললেই তো তোর খাওয়া হয়ে গেল… তাহলে আর অপ্রকাশিত রইল কই…

—যা বলেছিস… তুই ওসব লিখলে বাড়িতে ভাববে ডাক্তার বারন করেছে বলে লুকিয়ে তোর বাড়িতে এসে খাচ্ছি… শেষে যাওবা তোর কাছে গ্যাঁজাতে আসি তা-ও বন্ধ হয়ে যাবে…

—তাহলেই ভেবে দ্যাখ… যা ঘটেনি তা দুবার ঘটে যাবে, দুবার প্রকাশিত হয়ে যাবে… একবার যখন লিখব… আরেকবার যখন তোর বাড়ির লোকে জানতে পারবে…

—কি দুর্গতি বল দিকিন… নইলে কত ঘটনাই তো ছিল… সেই হামিদ ভাল্লুকওয়ালা, যার বউটা অনয় লোকের সঙ্গে সুযোগ পেলেই শুত… হামিদ রোজ রাত্তিরে ভাল্লুকনিটার সঙ্গে শুত বলে… ভাল্লুকটাকে করে-করে হামিদ নিজেও ভাল্লুক হয়ে যাচ্ছিল… ওর বউয়ের বোরখায় তুইও তো দুচারবার শীতের দুপুরে ঢুকেছিলিস… বলেছিলিস একবার, বোরখার মধ্যেকার নগ্নতা…

—মানুষ হয়ে রোজ রাত্তিরে একটা মাদিভাল্লুককে স্যাটিসফাই করা চাট্টিখানি কথা নয়… ওর বউটা কিন্তু যাব বলে তেতে থাকত… দশ মিনিটেই কেল্লা ফতে…

—ওটাই লেখ না… সেক্স ব্যাপারটায় যে কাস্ট-ক্রিড-রিলিজিয়ন… এমনকি মানবেতর ডাইমেনশান আছে… এসব নিয়ে তো কেউ গল্প-উপন্যাস লেখেনি এখনও… কিংবা বাদুড়িয়ার সেই বউটার গল্প লিখতে পারিস, যে জোনাকি ধরে ছুঁচসুতোর মালা গেঁথে কোমরে-হাতে-গলায়-খোঁপায় জড়িয়ে মাঝরাত্তিরে ল্যাংটোপোঁদে শকুন্তলা সেজে ঘুরে বেড়াত…

—হ্যাঁ, অনেক আংটি জড়ো করেছিল… আমাদেরো কত আঙটি গেল ঘটনা ঘটাতে… পেতলের নাহলে ফতুর হয়ে যেতুম… সে-সব কৃষ্ণপক্ষের তুনা হয় না… অন্ধকার না থাকলে প্রিয়তমা শব্দটা একেবারে বেমানান…

—তারপর আমাদের বন্ডেল রোডের মিসেস বসুরায়ের ঘতনাটা রয়েছে… সকাল থেকে সন্ধে মিস্টার বসুর সংসার সামলান… আর সন্ধে থেকে ভোর পর্যন্ত সামলান মিস্টার রায়ের সংসার… রাস্তার এপার-ওপার বাড়ি… শনি-রোববার মিস্টার বসুর ছুটি থাকে বলে মিসেস বসুরায়কে ছোঁননা মিস্টার রায়…

—আর বাচ্চা-কাচ্চা?

—দিনের বেলা যেগুলো হয়েছে তারা মিস্টার বসুর সঙ্গে থাকে… বাবা বলে ডাকে… আর রাত্তিরে যেগুলো হয়েছে সেগুলো মিস্টার রায়ের সঙ্গে… ড্যাডি বলে ডাকে… দুবাড়ির শ্বশুর-শাশুড়ি দেওর-ননদের মধ্যে যাতায়াত আছে… ছেলেমেয়েরা মেশামিশি করে… কারোর কোনোরকম টেনশান নেই… হ্যাপি এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি… তা আজ সতেরো বছর হতে চলল… বসুরায় নামটা অবশ্য পাবলিকেই মহিলাটিকে দিয়েছে…

—বুড়ো হলে?

—বসুরায়, বসু আর রায় তিনজনের জন্যে গোয়ার সমুদ্রের ধারে বৃদ্ধাশ্রমে অগ্রিম টাকা জমা দিয়ে এখন থেকেই বুক করা আছে…

—কিন্তু ক্লাইম্যাক্স বা হুইপক্র্যাক এনডিং কী হবে… সমাপ্তির ব্যঞ্জনা?… ছোটগল্প বলে কেউ মানবে না ওই ব্যাপারটা না থাকলে…

—মিসেস বসুরায়ের একটা প্রেমিক আছে, সিক্রেট, বোধহয় গড়িয়াহাটে, যেদিন ওনার মেন্সের ব্লিডিং বন্ধ হয় সেদিন প্রেমিকের বাসায় ঢুঁ মারেন… আসলে বাচ্চাগুলো ওই প্রেমিকের…

—সত্যি অনেক ঘটনা আছে তোর স্টকে… কিন্তু প্রবলেম হল যে রতন বিশ্বাসকে অপ্রকাশিত ছোটগল্প দিতে হবে… তুই যা বললি তা তো অলরেডি প্রকাশিত… বন্ডেল রোডের সবাই জানে… গড়িয়াহাটের লোকেও জানে… তুই তো গড়িয়াহাটে থাকিস…

—তাহলে শিবমন্দিরের সেই পুরুতমশায়ের ঘটনাটাও তো ছিল… সেই যে… যিনি গরদের শাড়ি পরে মন্দিরে পুজো করতেন যাতে শিব তুষ্ট হন…শল্যচিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন পুরুষমানুষ থেকে মেয়েমানুষ হয়ে পার্বতী হবার জন্যে…

—উঁহু, লেখা যাবে না… যা ঘটে গেছে তা নিয়ে কী করে লিখি বল… যা ঘটে গেছে তা তো স্বতঃপ্রকাশিত… আর আমায় তো দিতে হবে অপ্রকাশিত ছোটগল্প…

—তাহলে তোদের পাড়ার ওই ছেলেটার কথা লেখ না, যে প্রচুর মদ খেয়ে আত্মহত্যা করল, গায়ে কেরোসিন ঢেলে, যাতে হুইস্কিতে আগুন ধরে বুকপেট তাড়াতাড়ি পুড়ে যায়… আগে কখনও মদ খায়নি…

—বড় স্যাড ঘটনাটা… ওর মা ওর প্রেমিকাকে বিয়ে করতে দ্যায়নি, নিচু জাত বলে… ওর মা তো আগেই আরেকটা মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে রেজিস্ট্র অব্দি সেরে ফেলেছিল… কিন্তু বিয়ের আগের দিন মোক্ষম একখানা চোট ওর মাকে দিল…

—আত্মহত্যা করার কী আছে বুঝি না… আরে একজন মেয়ের যা-যা থাকে আরেকজন মেয়েরও একই জিনিস থাকে… মাপের হেরফের হতে পারে কেন না ব্যাপারটা প্রাকৃতিক… সত্তর বছর বয়সে পৌঁছে আমি তো কোনো তফাত দেখতে পাই না…

—লেখা যাবে না… লেখা যাবে না… ঘটে গেছে… প্রকাশিত হয়ে গেছে… যদিও ছেলেটার মা পাড়ায় একটা বিকল্প গল্প ছড়াবার চেষ্টা করছে… ছেলেটার প্রেমিকাই নাকি ল্যাং মেরেছে…

—মানুষ ছাড়া ছোটগল্প লেখা যায় না? ওই পুকুরে কতরকম মাছ রয়েছে… পলাশ গাছে কতরকম পাখি রয়েছে… নারকেল গাছে কাঁদি-কাঁদি ডাব রয়েছে… ঝোপে প্রজাপতি রয়েছে… ওই তো একটা বেঁজি দৌড়ে গেল… ওদের নিয়ে লেখ…

—ওদের তাহলে মানুষের মন দিতে হয়… সে তো শিশুসাহিত্য কেলেংকারি হয়ে যাবে… সবকিছুকে, সমস্তপ্রাণীকে, মানুষ বলে চালাবার ধান্দাবাজি…

—মানুষ বাদ দিয়ে ছোটগল্প হয় না?

—নাঃ… মানুষ কত মহান, কত দুঃখী, কত হেন, কত তেন, কত এই, কত সেই, তা দেখাতে হবে ইনিয়ে-বিনিয়ে… নইলে সার্থক লেখা হবে না… সার্থক লেখা না হলে আর গল্প কীসের… মহান গল্প না হলে মহান লেখক হওয়া মুশকিল… লেখকের মহান হওয়াটা ছোটগল্পের আল্টিমেট এইম…

—এতক্ষণে বুঝলুম রে… যা হয় না… যা হবার নয়… যা ঘটেনি… যা ঘতবে না… যা ঘটানো চলবে না… তাদের সাজিয়ে-গুজিয়ে তুলে ধরতে হবে…

—আহবকাল পত্রিকাটা বেরোলে তুই দেখিস… দেখবি সবাই রসিয়ে-রসিয়ে মানুষের মানুষগিরির কথা লিখেছে…

—এই দ্যাখ, তোর কলিং বেল বাজল… কেউ এসেছে বোধহয়…

—এখন আবার কে? কেবলওয়ালা, খবরের কাগজ তো পেমেন্ট নিয়ে গেছে… কাজের লোক কাজ করে চলে গেছে..

—দ্যাখ, চাঁদা-টাদা হবে হয়তো…

—কে?

—আজ্ঞে আমি…

—দরজা খোলা আছে… ভেতরে চলে এসো…

—গল্পটা আজকে দেবেন বলেছিলেন… হয়ে গেছে?

—এই যে, এনার কথাই তোকে এতক্ষণ বলছিলুম… রতন বিশ্বাস… আহবকাল পত্রিকার সম্পাদক…