Hungryalists লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Hungryalists লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০২২

মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে অনুপম মুখোপাধ্যায়

 অনুপম মুখোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে ১টি পুনরাধুনিক কাজ

এই মুহূর্তে, অর্থাৎ ২০১৯-এর পশ্চিমবঙ্গে এই যে উত্তপ্ত মে মাস চলছে, লোকসভা নির্বাচনের দামামাকে দূরাগত ঢক্কানিনাদ মনে হচ্ছে, যেন আমরা যে ট্রাইবের অন্তর্গত তার বিরাট পরবটি এসে পড়েছে, ঠিক এখনই, এই ভূতের নাচের মধ্যে, অশীতিপর মলয় রায়চৌধুরীকে আমার ভারতের একমাত্র বাংলাভাষী আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক বলে মনে হয়। আজ তিনিই একমাত্র জীবিত আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক ভারতীয় বাংলা ভাষায়। এটা আবেগ থেকে বলছি না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকেও বলছি না। এটা ঘটনা। ষাটের দশক থেকে আজ অবধি মলয় রায়চৌধুরীর সারাজীবনের সাহিত্যিক কাজকর্ম দেখলেই সেটা বোঝা যাবে। এই মুহূর্তেও তিনি প্রচুর লিখছেন, কিন্তু, মৃত্যুচেতনার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করছেন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে এই বয়সে এসে একরকম অনিশ্চিত হতাশাও হয়ত তাঁকে ঘিরেছে। কিছুদিন আগে আমাকে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে লিখেছেন- ‘আমাকে নিয়ে তো কেউ লেখে না! কী হল এত লিখে?’ এই জিজ্ঞাসার ন্যায্য হতাশা হয়ত শেষ জীবনে সবারই প্রাপ্য থাকে। যদি খুব ভুল না করে থাকি, রবীন্দ্রনাথও তাঁর শেষ জীবনে এই বোধটা থেকে মুক্তি পাননি। এটা বাংলাদেশ। এখানে বড় গাছগুলোকে আগাছারা আড়াল করতে পারে, কী করে পারে সেটা একটা দীর্ঘ প্রবন্ধের বিষয় হতে পারে, এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
তাছাড়া এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি পচে যাওয়া মাখনের মতো। তার বিশ্লেষণ হয়, কিন্তু ব্যাখ্যা হয় না। মলয় রায়চৌধুরীও সেই ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করে অসফল। তাই, যেটা তাঁর সফলতা, শেষ অবধি সেটা তাঁর কবি আর গল্পকার সত্বার জয়। প্রাবন্ধিক মলয়ের নয়। মলয় রায়চৌধুরী সেই ধুরন্ধর সাহিত্যিক যিনি জানেন সারা পৃথিবীতে কী লেখা হয়েছে, কী লেখা হচ্ছে, এবং সেই অনুসারেই তিনি জানেন আর কী লেখা যেতে পারে। কোন লেখা তাঁর অপেক্ষায় আছে, লিখতে বাকি আছে, এই মোক্ষম সচেতনতা ব্রিটিশ ভারতে বাঙালি সাহিত্যিকদের অনেকের মধ্যে ছিল। স্বাভাবিকভাবেই ছিল, কারণ তখন কলকাতা ছিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর, উপমহাদেশের রাজধানী, সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর, রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ডিরোজিও-মাইকেল-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের শহর, তখন সারা ভারতের মধ্যে কোনো চিন্তা প্রথম জাগ্রত হত বাঙালির ধূসর পদার্থে। আজ যা পরিস্থিতি, মলয় রায়চৌধুরীর মতো একজন লেখকের লেখা বোঝার লোক খুব কমে গেছে। তিনি জনসাধারণের জন্য লেখেন না, এটাই যদি সাধারণ চিন্তা হয়, সেটা আমি মেনে নিতে পারি না। মলয়ের কবিতার মধ্যে ‘পিপল’স পোয়েট’ হয়ে ওঠার শক্তি এখনকার যে কোনো কবির চেয়ে বেশি। মানুষ যে তাঁর কবিতা পড়ল না, তার একমাত্র কারণ তাঁর কবিতাকে মানুষের কাছে যেতে দেওয়া হল না। তাঁর উপন্যাস বেস্ট সেলার লিস্টে পাকাপাকিভাবেই থাকত, যদি তিনি প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথা বিকোতেন, অথবা, প্রতিষ্ঠান তাঁর জন্য নিজের দিশা বদলাত, যদি তার আদৌ কোনো দিশা থেকে থাকে।
আজ সেই লংকা নেই, কারণ অন্যরূপে রাবণ থাকলেও তার দশ মাথা নেই, অথচ যেদিকে তাকাবেন দেখবেন রাবণ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে, এই হয়ত মলয় রায়চৌধুরীর ব্যাখ্যাকৃত পোস্টমডার্ন পরিসর। যদিও, আমার মতে, যেমন আমি আমার পুনরাধুনিক বিষয়ক গ্রন্থে দেখিয়েছি, এই পরিসর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরেই কলকাতায় এসে পড়েছিল। মলয় রায়চৌধুরী এবং সমীর রায়চৌধুরী সেটাকে শনাক্ত করেন নব্বইয়ের দশকে, কিন্তু এমনভাবে করেন যেন সেটা সেই মুহূর্তেই প্রকটিত হল। জীবনানন্দ দাশ বা সমর সেনই যে তিরিশের দশকেই বাংলা কবিতার পোস্টমডার্ন এনে ফেলেছিলেন, মোটেই ৯০ দশকীয় কোনো পত্রিকার কাজ সেটা নয়, এটা কেন বলে ওঠেননি, আমার কৌতূহল আছে। ষাটের দশকে মলয়েরই নেতৃত্বাধীন হাংরি আন্দোলন কি প্রথম পোস্টমডার্ন সাহিত্য আন্দোলন নয় বাংলা ভাষার? অবিশ্যি পোস্টমডার্নে কোনো নেতা তো থাকতে পারে না। তাতে আর অসুবিধা কোথায়? ওই আন্দোলনের অন্তর্ভুক্তজনেদের মধ্যে অধিকাংশই তো মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁদের নেতা আজ আর মানেন না, তাঁকে হেয় করেন, তাঁদের কার কারও সন্তানরাও মলয়ের প্রতি বিদ্বিষ্ট, এমনকি এমন অনেকেই আছেন যাঁরা মলয়কে হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস থেকে বাদ দিয়ে স্বস্তি পেতে চান। শ্রীকৃষ্ণকে বাদ দিয়েই কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে, সেই চেষ্টাটাও ভেরি মাচ পোস্টমডার্ন, তাই নয় কি? হাংরি আন্দোলনের শত্রুরাই আজ ঠিক করে দিচ্ছে হাংরি আন্দোলনের ইতিহাস, এ এক প্যারাডক্স। আবার এটাও ঠিক, মলয় এগুলো নিয়ে না ভাবলেই পারেন। হাংরি আন্দোলন নিয়ে তিনি এই ২০১৯-এও বেশ অবসেসড্‌। ৫০ বছর আগে ফেলে আসা আন্দোলনটিকে তিনি আজও ভুলতে পারেননি। নিজেই ব্লগ বানিয়ে তার আর্কাইভ করেন। আজও হাংরি নিয়ে গদ্যের পর গদ্য লেখেন। এই অবসেসন তাঁর সাম্প্রতিক সাহিত্যকর্মে কিছুটা হলেও ছায়া ফেলে থাকবে, এমন আশঙ্কা মাঝেমধ্যে আমার মাথায় এসেছে। আত্মবিস্মৃত বাঙালিকে তিনি কি কিছুটা পটাতে চাননি এই একটা ব্যাপারে? এই একটাই ব্যাপারে?
দিল্লিতে ভারতের রাজধানী চলে যাওয়ার পরে, দেশভাগের দ্বারা বাঙালিকে ২ টুকরো করে দেওয়ার পরে, কংগ্রেস-নকশাল-সিপিএম-মাওবাদ-তৃণমূল-বিজেপি বিন্দুগুলিকে স্পর্শ করে করে আজ বাঙালি ভারতের একটি প্রান্তিক রাজ্যের অবহেলিত ফতুর জনসাধারণে পুনরায় রূপান্তরিত হয়েছে, পলিটিক্স সাহিত্য আর সংস্কৃতির দিক থেকে বাঙালি আজ অধঃপতিত হয়েই চলেছে, যেমন অবস্থায় সে প্রাক্‌-ব্রিটিশ যুগে ছিল, কোনো মোগল সম্রাটের তখন বাংলাদেশে পা রাখার প্রয়োজনই হত না, আজ পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রীয় মূল্য ৪২টা লোকসভা আসনেই চুকিয়ে ফেলা যাচ্ছে। তার ফলেই সিনেমা বা সাহিত্যের চেয়ে পলিটিক্স আজ অনেক বেশি অন্তঃসারশূন্য ও দক্ষিনী সিনেমার চেয়েও এন্টারটেইনিং। মন খারাপ হলে মুখর নেতা বা মুখরা নেত্রীর স্ট্যান্ড আপ কমেডি ভিডিও দেখে নেওয়া যাচ্ছে ইউটিউবে গিয়ে, এবং হা হা হো হো করে নেওয়া যাচ্ছে। মলয় রায়চৌধুরী এটাকেই পোস্টমডার্ন পরিসর বলবেন, যথার্থই বলবেন, কিন্তু এই পরিসর তাঁকেও যথেষ্ট হেনস্থা করছে, কারণ, তাঁকে এখানে অনেকেই বুঝতে পারছে না, না বুঝে রিঅ্যাক্ট করছে, বুঝেও চুপ করে থাকছে, তাঁরই ব্যাখ্যা করা পরিসরে তিনি স্বয়ং কি যথেষ্ট বেমানান নন? সেটা না হলে তিনি বড় নন।
মলয় রায়চৌধুরীর স্বাভাবিক বিরোধাভাসটা এই যে, তিনি নিজেকে ছোটলোক ইত্যাদি দাবি করেও, বাঙালির সামগ্রিক হড়কে যাওয়ার কবন্ধ শরিক হননি, বিশেষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক খুড়োর কলে নিজেকে জুড়ে ফেলেননি, বরং নিজেকে সারা পৃথিবীর সাপেক্ষে জায়মান লেখক করে তুলতে পেরেছেন। তাঁর উপন্যাস এবং কবিতা এবং প্রবন্ধকে প্রাদেশিক চেতনার বাইরে দাঁড়িয়ে পড়া যায়। এটা এই মুহূর্তে জীবিত দ্বিতীয় কোনো বাঙালি সাহিত্যিক সম্পর্কে আমি বলতে পারছি না। এটা আমার অজ্ঞতাপ্রসূত হলেও, দৃঢ় ধারণা, এবং কোনো প্রশংসাবাক্য নয়। একজন লেখকের জীবনে প্রায়ই এটা ঘটে যে, তিনি নিজের জন্য একটি লাগসই ভাবমূর্তি বেছে নিলেন, কিন্তু নিজেকে সেই মাপে ঢালতেই পারলেন না। মলয় রায়চৌধুরীর ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। তিনি নিজেকে বিহারের ইমলিতলা থেকে উঠে আসা ছোটলোক হিসাবে পেশ করতে চাইলেন, কিন্তু হাড়ে হাড়ে বোঝা গেল এই লেখকটি সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বংশপরিচয়েই অধিক মানানসই, কারণ, মলয়ের মধ্যে যে আভিজাত্য আছে, যে আত্মসচেতন উদাসীনতা আছে, তা গত ১০০ বছরের বাংলা সাহিত্যে যথেষ্ট দুর্লভ, তাঁর মধ্যে অস্তিত্বের উৎকণ্ঠা থাকলেও বাংলা বাজারের ইতরতা নেই, প্রান্তিকতা যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা স্বরচিত। তাঁর আচরণের মানবিক স্তরটিতে আছে এক আশ্চর্য খেঁকুরেপনা, অমরত্বের অদ্ভুত উদাসীন বাসনা আর দুর্দান্ত সেন্স অফ হিউমারের মিশ্রণ, যেটা তিক্ত যোদ্ধাকে মানায়, ব্যর্থ প্রেমিককে মানায়, প্রতিষ্ঠার ভিখারী বা প্রতিষ্ঠানের দালালদের কিন্তু মানায় না। মলয় নিছক ছোটলোক নন। তিনি একজন অভিজাত ছোটলোক। ছোটলোক অভিজাত নন। বলা বাহুল্য এখানে আমি জাতপাতের কথা বললাম না।
মলয় রায়চৌধুরী যে শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায় বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়দের চেয়ে ঢের বড় মাপের সাহিত্যিক এটাও মুক্তকন্ঠেই বলতে চাই। কারণ এঁদের মতো তিনি বিগত শতাব্দীর কবিলেখক নন। তিনি একবিংশ শতাব্দির সঙ্গে তুমুলভাবে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, তাঁর উপন্যাস থেকে বাংলা সিরিয়াল হবে না। সিনেমাও হওয়া মুশকিল। তাঁর কবিতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে উদাত্ত আবৃত্তি করা চলবে না। মলয় মেজর সাহিত্যিকের ধারণাকে অস্বীকার করেন, সেটা তাঁর কিছুটা গড়ে তোলা এবং কিছুটা আমদানিকৃত তত্ববিশ্বের ব্যাপার। আমি মলয় রায়চৌধুরীর তত্বকে মলয়ের কবিতা আর উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা খুব জরুরি মনে করি না। আমি মেজর সাহিত্যিকের ধারনায় কঠিনভাবে বিশ্বাস করি, এবং, মলয় রায়চৌধুরীকে একজন যথার্থ মেজর সাহিত্যিক বলে মনে করি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বলেছিলাম কবি হিসেবে শঙ্খ ঘোষের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল না, বাঙালি কাউকে দিতেই হলে ওটা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে দেওয়া যেত। আমার এই উক্তিতে ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ে যায়, এবং অনেকের দ্বারা আক্রান্ত হই। তাঁদের মধ্যে একজন বদমেজাজি সম্পাদক বলেছিলেন আমি মলয় রায়চৌধুরীর নাম কেন করলাম না জ্ঞানপীঠের যোগ্য প্রাপক হিসেবে। সম্ভবত এই উক্তি যিনি করেছিলেন আমাকে তিনি মলয় রায়চৌধুরীর নিকটস্থ গুণমুগ্ধ একজন ঠাউরেছিলেন এবং ভেবেছিলেন মলয়ের নাম না করাটা আমার অবস্থানের ভণ্ডামি ধরিয়ে দেবে। মজার ব্যাপার হল, সেদিন দেখলাম মলয় রায়চৌধুরী ওই ব্যক্তির ওই উক্তিকে নিজের ব্লগে সযত্নে জায়গা দিয়েছেন, অর্থাৎ গুরুত্ব দিয়েছেন, যদিও নিজে কোনো মন্তব্য করেননি।
আজ এই লেখায় স্পষ্ট বলতে চাইব, মলয়কে আমি এই মুহূর্তের বাংলাভাষায় একমাত্র আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক মনে করলেও শুধু জ্ঞানপীঠ কেন অন্য যে কোনো ভারতীয় পুরস্কারের প্রাপক হিসাবেই মলয়ের নাম কল্পনা করতে পারি না। পুরস্কার সর্বদাই উপর থেকে আসে, এবং হাত পেতে সেটা নিতে হয়। সেই পুরস্কারই নেওয়া চলে যেটার উচ্চতা লেখকের চেয়ে বেশি, এবং সেটায় তাঁর কোনো গ্লানি নেই। রবীন্দ্রনাথকে নোবেল প্রাইজে মানায়, রবীন্দ্র পুরস্কার তাঁর নেওয়া চলে কি? জ্ঞানপীঠও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মানাত, তিনি পেয়েওছিলেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মানাত না। মলয় রায়চৌধুরীকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার দেওয়ার অর্থ তাঁর স্তরকে মাঝারিয়ানায় নামিয়ে এনে তাঁর জায়মানতাকে খতম করে দেওয়া। মলয়ের মতো সাহিত্যিকরা পুরস্কৃত হতে জন্মান না। পুরস্কার তাঁদের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দ্যায়। যে কোনো সাহিত্যিকেরই বারোটা বাজায় একটা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার, কিন্তু তাতে সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যের খুব একটা ক্ষতি হয় না। মলয় রায়চৌধুরীকে পুরস্কৃত করলে, কোনো সাহিত্যসভায় ধরে নিয়ে গিয়ে ফিতে কাটালে, কোমর নুইয়ে প্রদীপ জ্বালালে মলয়ের ব্যক্তিগত ক্ষতি কী হবে সে তো বললামই, বাংলা সাহিত্যের অনেক কিছুই ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে, সেই বিচ্ছিরি জট আর খোলা যাবে না।
প্রতাপশালী কোনো প্রতিষ্ঠানের দেওয়া মুকুট পরলেই যে ওঁর মাথাটি হাতছাড়া হয়ে যাবে, মলয় সেটা নিজে খুব ভাল জানেন। যে কোনো মুকুটই আসলে একটি সাব্লিমেটেড টুপি। উনি যদি কাউকে মাথা কেটে পাঠান, সেটা প্রেমের উপহার হবে, লোভের নয়। সম্প্রতি ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাসে উনি লিখেছেন- ‘প্রতিষ্ঠান কখন আপনাকে টুপি পরিয়ে দেবে আপনি বুঝতেই পারবেন না।’ সম্ভবত এই উক্তি উনি শৈলেশ্বর ঘোষের প্রসঙ্গে করে থাকবেন, এটা আমার অনুমান, কারণ মাথায় শীতের টুপি পরে প্রয়াত শৈলেশ্বর ঘোষ কোনো একটা সাহিত্যমেলা উদ্বোধন করছেন, এমন একটা ছবি সেই সময়ে ফেসবুকে ভেসে উঠেছিল। মলয় এভাবেই খোলাখুলি কথা বলতে পারেন এই বৃদ্ধ বয়সেও, এমনকি, নিজের তথাকথিত রাইভ্যালদের নিয়ে খিল্লি করতেও উনি কোনো দ্বিধা দেখান না। আমার মনে হয়, এটা শিক্ষণীয়। সোনার হরিণের প্রতি এই বেপরোয়া সাহিত্যিকের কোনো লোভ নেই, কারণ তিনি জানেন সোনার হরিণ হয় না, সেটার পিছনে অবশ্যই কোনো মায়াবী ফাঁদ লুকিয়ে থাকে, অনেক বড় কিছু কেড়ে নেওয়ার জন্য। বঙ্কিম পুরস্কার, আকাদেমি পুরস্কার পেয়ে মলয়ের আখের কিছুই গোছানো হবে না। যেটার প্রতি ওঁর আসল লোভ, সেই ইতিহাস তাহলে ভড়কে যাবে। মলয় তাই নিজেকে ইতিহাসে রাখার দায়টা নিজেই নিয়েছেন, এবং ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পত্রিকাগুলোর পাশাপাশি ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণ ব্যবহার করে নিতে। ইন্টারনেটকে মলয় রায়চৌধুরী যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা শিক্ষণীয়। এটা তাঁর কাছে বাঙালির শেখার আছে।
একটা কথা মলয়ের বিরোধিরা প্রায়ই বলে থাকেন, যে মলয় খুব আত্মপ্রচার করেন। নিজের ব্লগ, নিজের উইকিপিডিয়া, নিজের সমস্ত লেখার সংরক্ষণের ব্যাপারে উনি সর্বদা যত্নশীল। নিজের লেখা নিজেই গিয়ে লোককে পড়তে বলেন। নিজের লেখার লিংক কেউ না চাইলেও তার ফেসবুক টাইমলাইনে গিয়ে পোস্ট করে আসেন। বলা বাহুল্য, একজন কিংবদন্তি সাহিত্যিকের কাছে বাঙালি এই আচরণ আশা করে না, এটা বাঙালির অভ্যাস আর প্রত্যাশার বাইরের ব্যাপার। আমি আগেই বলেছি মলয় রায়চৌধুরী অমরত্বের বাসনা রাখেন, ইতিহাসে থাকতে চান নিজের মর্জি অনুসারী ইমেজে। সেটাকে লোভ বললেও কি খুব খারাপ হয়? আমার মতে, মলয়ের অতীতচারিতা অর্থাৎ হাংরি-অবসেসন যদি বাদ দিই, একজন সাহিত্যিকের অমরত্বের বাসনা, যশের আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত, সে বঙ্কিম যাই বলে থাকুন, সাহিত্যক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সফলতার লোভ খুবই প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার। লেখক কোনো সন্ন্যাসী তো নন! কাম ছাড়া যেমন পরিবার হয় না, ক্রোধ ছাড়া যুদ্ধ হয় না, সঠিক লোভ ছাড়া একজন শিল্পীর অগ্রগতি হয় না। ‘অগ্রগতি’ শব্দটাও মলয় রায়চৌধুরীর তত্ববিশ্বে বেমানান। কিন্তু আমার প্রিয়। পরিমিত ও সুনির্বাচিত লোভের দিকে একজন স্রষ্টা এগোবেন, এটা আমি সমর্থন করি। সেই লোভ বাঘের, তাজা রক্ত আর গরম মাংস নিজের সামর্থে লাভ করার, সেই লোভ হায়নার নয় যে যে কোনো একটা মৃতদেহ হলেই চলে যাবে। কেন একজন লেখক তাঁর লেখা একজন পাঠকের সামনে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেবেন না? কেন একজন পাঠককে শিকার করবেন না তিনি! বাঘ যেভাবে তার হরিণকে ধরে, একজন লেখকেরও কাজ তাঁর পাঠককে ধরা, দাঁত এবং নখের সার্বিক প্রয়োগ করে। সভ্যতা ভব্যতা প্রোটোকল এসব ছাপোষা আর ক্রীতদাসদের মানায়, কবিকে নয়।
এবং মলয় জানেন, তিনি হাংরি আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ হলেও, তাঁর উপরে অজস্র লেখালেখি হলেও, গবেষণা হলেও, তাঁকে নিয়ে কাজ করে পিএইচডি নিয়ে কেউ কেউ ঘুরে বেড়ালেও, তিনিই স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র জেলখাটা কবি হলেও, সাধারণ বাঙালি তাঁর নামই আজ অবধি জানে না। তারাই মলয়ের নাম জানে যারা স্বয়ং লেখালেখি করে, অথবা বাংলা সাহিত্যের হার্ডকোর পাঠক। আজ থেকে প্রায় বছর পনের আগে আমি প্রথম মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আলাপিত হই একজন বিখ্যাত সাহিত্যিককে বিশেষ দরকারে ফোন করতে গিয়ে রং নাম্বার ডায়াল করে ফেলায়। মলয় বুঝতে পেরেছিলেন আমি কাকে ফোন করতে গিয়ে তাঁকে ফোন করেছি। কিন্তু আমি লজ্জিত হলেও, তিনি রাগ করেননি। বরং সাগ্রহে আমার মতো একজন আনকোরা ছোকরাকে জানিয়েছিলেন তাঁর নাম মলয় রায়চৌধুরী, এবং ‘তিনিও’ লেখালেখি করে থাকেন। আমার মনে হয়েছিল নিজের এই পরিচয় তাঁকে দিতে হয়, নিজের পরিচয় নিজেই দিতে তিনি অভ্যস্ত, কারণ তাঁর সঙ্গে জনসাধারণের পরিচয় করে দেওয়ার এজেন্সি তাঁর কাছ থেকে কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান নেয়নি, তিনিও দেননি। এটা শিক্ষণীয়। আমি তাঁর কাছে এটা শিখেছি। আমি যে আজ নিজের ঢাক বাজাতে কোনো দ্বিধা করি না, কারণ আমিই প্রথম নই, আমার আগে মলয় আছেন। পোস্টমডার্ন মলয় নন। বাঘ মলয়।
এক বা আরও বেশি ব্যক্তি, দাড়ি, চশমা এবং ইন্ডোর-এর একটি ক্লোজআপ হতে পারে
ন


মলয় রায়চৌধুরীর 'ডোমনি' : বিকাশ দাস

 ডোমনি" কবিতা পুস্তিকার ভূমিকা । লিখেছেন বিকাশ দাস

ডোমনির সঙ্গে আমার পরিচয় এই বইয়ের কবি মলয় রায়চৌধুরীর সূত্রে । আমি ও মলয় রায়চৌধুরী একই শহরে থাকি, মুম্বাইতে। আমরা দু'জনে একে আরেকজনকে চিনি, কবিতার সড়ক দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াতের সময় আমাদের বাক্য-চিত্রকল্প-পংক্তি নিজেদের মধ্যে কথা বলে নেয় । এবার ডোমনিকে সাজিয়ে-গুজিয়ে নিয়ে যাবো মলয়দার বাড়িতে, তাঁর হাতে সঁপে দেবার জন্য । ডোমনির বয়স আমার দু'জনের থেকে কয়েক শতক বেশি, তবু সে চিরতরুণী, যখন তাকে কবিরা ডোম্বী বলে চিনতেন ।
মলয় রায়চৌধুরীর কবিতার বিশেষ কোনো টেমপ্লেট নেই বলেই আমার মনে হয়, যেমন আছে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের । এই ব্যাপারে মলয় রায়চৌধুরীর কবিতাগুলি প্রতিটি বইতে স্বীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে দেখা দিয়েছে, মলয় রায়চৌধুরীর প্রিয় কবি বিনয় মজুমদারের মতো । ষাটের দশকে সাহিত্য-জগতে ঝড়-তোলা 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' থেকে আরম্ভ করে 'শয়তানের মুখ', 'জখম', 'কবিতা সংকলন', 'মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর', 'চিৎকারসমগ্র', 'ছত্রখান', 'যা লাগবে বলবেন', 'আত্মধ্বংসের সহস্রাব্দ'. 'পোস্টমডার্ন আহ্লাদের কবিতা', 'কৌণপের লুচিমাংস', 'ছোটোলোকের কবিতা' এবং সাম্পতিক 'মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো' -- প্রতিটি কাব্যগ্রন্হে মলয় রায়চৌধুরীর কবিতায় পরিবর্তন ঘটেছে যা অভাবনীয় । অতি সাধারণ কথার বাক্যে অসাধারণ অন্তর্নিহিত অর্থ ।
আমার মনে হয় তাঁর কবিতায় পরিবর্তন গুলো এসেছে তাঁর অভিজ্ঞতার দৃষ্টিকোন থেকে । তিনি চাকুরি আরম্ভ করেছিলেন পাটনায় ব্যাঙ্কনোট পোড়াবার কাজ দিয়ে, যা আমরা জেনেছি তাঁর প্রথম উপন্যাস 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস' থেকে । তারপর কৃষি-উন্নয়নের চাকুরিতে চলে গেলেন লখনউ এবং উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক ঘনঘটার ছায়া পড়তে লাগল তাঁর 'মেধার বাতানুকূল ঘুঙুর' বইয়ের ও পরের কবিতাগুলোয়, তাঁর উপন্যাস 'জলাঞ্জলী' ও 'নামগন্ধ'-তে । লখনউ থেকে মলয় রায়চৌধুরী চলে গেলেন মুম্বাই ও মুম্বাই থেকে ফিরে এলেন কলকাতায় গ্রামীণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসাবে । তাঁর স্মৃতিকথা থেকে জেনেছি যে পাটনা ছাড়ার পর তিনি প্রায় দেড় দশক কবিতা লেখেননি এবং প্রচুর বিভিন্ন ভাষায় পড়াশুনা করতেন, ভারতের গ্রামেগঞ্জে চাকুরিসূত্রে ট্যূর করে বেড়াতেন । স্বাভাবিক যে তাঁর কবিতায় সেই পড়াশুনা এবং দরিদ্র গণসংযোগ প্রতিফলিত হয়েছে ।
'চিৎকারসমগ্র', ছত্রখান', 'যা লাগবে বলবেন' ও 'আত্মধ্বংসের সহস্রাব্দ'-এর পর তিনি যখন সরাসরি কাব্যগ্রন্হের নামকরণ করলেন 'পোস্টমডার্ন আহ্লাদের কবিতা, তখন আমরা বুঝতে পারি তিনি কবিতায় ঠিক কী ধরণের বৈশিষ্ট্য আনতে চাইছেন বিশ্বের দরবারে । এই সময়ে মলয়দা তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরীর পত্রিকা "হাওয়া৪৯"-এর একজন পরামর্শদাতা হিসাবে বিভিন্ন দেশের সাহিত্যভাবনা ও কবিতা-লেখন নিয়ে দাদা ও অন্যান্য অনেকের সঙ্গে আলোচনা করতেন ।
মলয় রায়চৌধুরী যে নিজের কবিতার টেমপ্লেট গড়ে তোলেননি তা যতদূর মনে হয় স্বেচ্ছাকৃত । কিন্তু 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতা ও তার দীর্ঘ মামলার কারণে তাঁর কবিতায় বহু পাঠক যৌনতা খুঁজে পান । আমি নিশ্চিত যে 'ডোমনি' বইয়ের কবিতাগুলোয় তাঁরা যৌনতা খোঁজার চেষ্টা করবেন । 'ডোমনি' যৌনতাহীন হবার কোনো কারণ দেখিনা, কেননা সে তো আদপে ডোম্বী, চর্যাপদের ডোম্বী, মলয় রায়চৌধুরীর প্রেম ও আদরে সে উত্তরাধুনিক ডোম্বী তরুণী ।
বিকাশ দাস
ফটোর কোনো বিবরণ নেই।

শনিবার, ২২ মে, ২০২১

মলয় রায়চৌধুরী : নারীস্তনের যৌনতা

 নারীস্তনের যৌনতা : মলয় রায়চৌধুরী

যেভাবে বুক দুটোকে বেঁধে রাখিস

মনে হয় ওরা তোর মেয়ে

একটুখানি ঢিলে দিলে বেয়াড়া অসভ্য হয়ে

ডেকে আনবে পাড়ার ছেলেদের

স্নানের সময় যেই খুলে দিস

হুটোপাটি করে ওরা স্নান করে

কেউ কাউকে একটু কষ্ট না দিয়ে

যে যার মতো একা (দুর্বার জন্য কবিতা -- মিতুল দত্ত )

স্তন শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘যে শব্দ করে’। অর্থাৎ জানিয়ে দেয় যে, যৌবন আসছে দেহে। হাংরি আন্দোলনের সময়ে একটা বিয়ের কার্ডে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে লিণ্ডসে স্ট্রিটে এক তরুণীর খোলা বুক প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে, শিল্পানুরাগীরা যেন তা দেখার জন্য সন্ধ্যাবেলায় অকুস্হলে আসেন । কার্ডটি পাঠানো হয়েছিল মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবিদের এবং তাঁদের অনেকেই চটে গিয়েছিলেন । আবু সয়ীদ আইয়ুব চটে গিয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গকে হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নালিশ করেছিলেন । বুদ্ধিজীবিদের চটে যাবার প্রধান কারণ হল আধুনিক সমাজে নারীস্তনের যৌনতা, যার প্রতি পুরুষদের টান নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আব্রাহামিক সংস্কৃতি ভারতে প্রবেশের আগে কিন্তু নারীর বুক ঢেকে রাখার চল সমাজের সব কয়টি স্তরে এবং সব কয়টি অঞ্চলে ছিল না । রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ আবু সয়ীদ আইয়ুব ‘কড়ি ও কোমল’-এর ‘স্তন’ কবিতাটা পড়েননি, সেকথা মানা যায় না :

 বাহিরে,

সৌরভ সুধায় করে পরান পাগল।

মরমের কোমলতা তরঙ্গ তরল

উথলি উঠেছে যেন হৃদয়ের তীরে।

কী যেন​​ বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে

বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়,

সহসা আলোতে এসে গেছে যেন থেমে--নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল,

বিকশিত যৌবনের বসন্ত সমীরে

কুসুমিত হয়ে ওই ফুটেছেশরমে মরিতে চায় অঞ্চল-আড়ালে।

প্রেমের সংগীত যেন বিকশিয়া রয়,


উঠিছে পড়িছে ধীরে হৃদয়ের তালে।

হেরো গো কমলাসন জননী লক্ষ্ণীর--

হেরো নারীহৃদয়ের পবিত্র মন্দির।

নারীর স্তন সম্পর্কে পুরুষেরা ইন্দ্রিয়কাতর ; সব কয়টি ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে তোলে নারীর বর্তুল স্তন । যৌবনে পৌঁছেই নারীর মনে হয় যে পুরুষরা তাদের সঙ্গে নয়, তাদের স্তনের সঙ্গে কথা বলে । তার সত্যতা হলো যে মুখমণ্ডল সুশ্রী না হলেও পুরুষ অবচেতনে স্তনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বাবা-মায়ের বাছাই করা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হয়, এমনকী প্রেমেও পড়ে একই কারণে।

পোপ যখন পর্তুগাল আর স্পেনকে নির্দেশ দিলেন যে তারা যথাক্রমে পূর্ব আর পশ্চিম বিশ্বকে লুটপাটের জন্য ভাগাভাগি করে নিক, তার পর  সমস্ত প্রাচীন  সংস্কৃতি মূল থেকে ধ্বংস হয়ে গেছে -- মিশরীয়, পারস্য, মেসোপটেমিয়ান, গ্রিক এবং রোমান, আমেরিকার মায়া ও অ্যজটেক  এবং আরও আদিম জীবন-পদ্ধতি। ভারতে তারপর আবির্ভাব হলো ইসলামি শাসকদের । নগ্নতাকে যৌন ‘পাপ’ হিসাবে দেগে দিয়েছে তারাই, এমনকী যৌনতাকেও তারা লজ্জাজনক পাপকর্ম হিসাবে চিহ্ণিত করে দিয়েছে বিভিন্ন উপনিবেশে।  স্তন যেহেতু যৌন আহ্লাদ উদ্রেক করে, তাই স্তন ঢাকার চল শুরু হল তাদের আবির্ভাবের পর । অজন্তায় বুদ্ধের মা নিজের স্তন ঢেকে রাখেননি, এবং তা সম্ভব হয়েছে ভারতে নগ্নতাকে লজ্জাজনক মনে করে হতো না বলে । দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু আদিবাসদীরা এখনও স্তনকে খোলা রাখেন -- প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেকব জুমার নবম বিয়েতে তাঁর হবু স্ত্রী সমেত আগের বউরা আর কুড়িটা বাচ্চাদের মধ্যে মেয়েরা বুক খুলে নেচে ছিলেন ।

প্রাচীন ভারতে স্তনের সঙ্গে যেমন ফার্টিলিটির সম্পর্ক ছিল তেমনই ছিল যৌনতার । ধনী পরিবারের নারীর পরিধান ছিল উত্তরীয়, অন্তরীয় আর কোমরবন্ধ -- উত্তরীয় এখনকার ওড়নির মতন যেটি দিয়ে বুক বাঁধা যেতো । অনেকে বাঁধতেন না, কেবল ঢেকে রাখতেন । মোগল বেগমরাও যে স্বচ্ছ মসলিনে ঢেকে রাখতেন তা এঁকে গেছেন মিনিয়েচার চিত্রকররা । জেনানা মহলে তাঁরা স্তনকে লুকোবার চিন্তায় ভুগতেন না তার কারণ খোজারা ছিল তাঁদের রক্ষী। কোনো কোনো বেগম, যাঁদের বিয়ে হতো না, তাঁরা স্তনে খোজাদের আদর নিতেন ।

নারীর স্তনের প্রতি বয়ঃসন্ধি-অতিক্রান্ত স্বাভাবিক আধুনিক পুরুষের যৌন আকর্ষণ  অদম্য । ‘স্বাভাবিক’ এইজন্য বলছি যে বয়ঃসন্ধির পর কিশোরেরা কিশোরীদের বদলে অন্য কিশোরদের প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করতে পারে । কোনো কিশোরী অন্য কিশোরীর প্রতি আকর্ষিত হলে তারা পুরুষের মতো পরস্পরের স্তনকে যৌন-আহ্লাদের আরেকটি উৎস হিসাবে ব্যবহার করতে পারে।    নারীর  স্তন স্বাভাবিক পুরুষের কাছে সবচেয়ে ‘রহস্যজনক’। বয়ঃসন্ধি কালেই এই ভাবনার উৎপত্তি। একটি ছেলে যখন বড় হতে থাকে, তখন সে নারী শরীরে এমন একটি অংশ দেখতে পায়, যা তার নিজের শরীরে নেই। এই ভাবনা থেকেই নারীর স্তন, বিশেষ করে দুই স্তনের মাঝের খাঁজ,  তার কাছে আজীবন রহস্যজনক ও আকর্ষণীয় রয়ে যায়। স্তন দেখে আধুনিক পুরুষের শরীরে যৌন উত্তেজনা অনুভূত হয় এবং ঋতুমতী তরুণীরা সেকথা ক্রমশ উপলব্ধি করেন। যে নারীদের স্তন অপেক্ষাকৃত ছোটো, তাঁদের যৌন-হীনমন্যতায় ভোগার সম্ভাবনা থাকে। এখন তাই সিলিকন জেলের সাহায্যে স্তনকে বড়ো, নিটোল আর স্হায়ী করার শল্যচিকিৎসা জনপ্রিয় । 

মানুষই হল একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী যার যৌন উত্তেজনার সঙ্গে স্তনের সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত বড়ো মাপের স্তনের প্রতি পুরুষ বেশি আকর্ষণ অনুভব করে। নারী শরীরের অন্যতম নরম অংশ হল স্তন। এই কোমলতা পুরুষকে আকর্ষণ করে। ফলে স্তন স্পর্শ করতে, মুখ দিতে, মাথা রাখতে, এমনকী নারী দুই হাতে দুটি স্তনকে পরস্পরের সঙ্গে চেপে সঙ্গমছিদ্র তৈরি করলে পুরুষ আগ্রহ বোধ করে। নারী-স্তন পুরুষের কাছে অত্যন্ত আরামদায়ক। স্তনে মাথা রেখে বিশ্রাম নেওয়া তার সুপ্রাচীন অভ্যাস। জীবজগতে একমাত্র মানুষের ক্ষেত্রে নারীর স্তন বয়সের সঙ্গে মাপে বড়ো হয়, যখন কিনা স্তন্যপায়ী পশুদের স্তনের মাপ বড়ো হয় তারা পোয়াতি হয়ে বুকে দুধ আসার পর ; বাচ্চা বড়ো হবার পর আবার আগের মতো হয়ে যায় ।  ঋতুর বয়সে পড়লে নারীর বুকে কেন চর্বি জমে অমন আকর্ষক পিণ্ড গড়ে ওঠে তার নানা রকম ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন গবেষকরা। কিন্তু প্রধান তর্ক হল যে তা পুরুষকে আকর্ষণের জন্য প্রকৃতির অবদান । ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘দি কেমিস্ট্রি বিটউইন আস : লাভ, সেক্স অ্যান্ড দি সায়েন্স অব অ্যাট্রাকশান’ বইতে ল্যারি ইয়াং ও ব্রায়ান আলেকজান্ডার জানিয়েছেন যে নারীর স্তন সম্পর্কে পুরুষদের অবশেসন ঘটে যখন সে মায়ের কোলে শুয়ে দুধ খায় এবং মায়ের অক্সিটোসিন হরমোন নির্গত হয় যার দরুন স্তনের সঙ্গে পুরুষের পাকা বাঁধন তৈরি হয়ে যায়, অবচেতনায় গেঁথে যায় । পুরুষ তার সঙ্গিনীর মধ্যে সেই একই বাঁধনযোগ্যতা খোঁজে আর তার জন্য সে বড়ো মাপের স্তনের প্রতি আকৃষ্ট হয় । যারা বেশ্যালয়ে যাতায়াত করে তারাও সুন্দর মুখমণ্ডলের বদলে বর্তুল স্তন আর খাঁজের খদ্দের হয়ে ওঠে । পুরুষ যখন চোখে দেখে, ছোঁয়, মুখ দেয়, টেপে, তখন তার অবচেতনায় শৈশবের ভালোলাগা স্মৃতি কাজ করে । বড়ো মাপের স্তনের প্রতি পুরুষের আকর্যণের কারণ হল অবচেতনে তারা স্তনকে দুধের ভাঁড়ার হিসাবে দ্যাখে ; যতো বড়ো স্তন ততো বেশি দুধ । সন্তান প্রসবের পর কোনো কোনো নারীর অত্যধিক দুধ হয় যা আগেকার কালে গেলে ফেলে দেবার চল ছিল ; এখন ডাক্তাররা বলেন যে তা সংগ্রহ করে অন্যান্য শিশুদের দিতে কিংবা তা স্বামী নিজেই স্তন থেকে পান করতে পারেন ।

ভারতে নারীস্তনের যৌনতার ভাস্কর্য ও আঁকার গুরুত্ব বহু প্রাচীন এবং সেই স্তনগুলো ছোটো মাপের যে নয় তা আমরা খাজুরাহো, মীনাক্ষীমন্দির, কোনারক এমনকি অজন্তাতেও দেখেছি । পক্ষান্তরে ইউরোপে নারীস্তনের  যৌনতা অতো প্রাচীন নয় । গ্রিসে যখন ভাস্কর্যে নারীস্তনকে  গুরুত্ব দেয়া আরম্ভ হল তখন সেই নারীদের স্তন ছিল ছোটো মাপের । সৌন্দর্য ছিল একটি মনঃশারীরিক বিষয় যা বুকের আকারের মতো চরিত্র এবং ঐশ্বরিক অনুগ্রহের সাথে জড়িত ছিল । ক্লিওপেট্রার যে মূর্তিগুলো পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় তাঁর স্তন ছিল ছোটো মাপের অথচ তাঁর আকর্ষণ সম্রাটরাও প্রতিরোধ করতে পারেননি । রেনেসঁসের সময়ে আঁকা ভার্জিন মেরি আর ইভের স্তনও অনেক ছোটো করে এঁকেছেন চিত্রকররা, কেননা তাঁদের থেকেই ‘অরিজিনাল সিন’ তত্ত্বের আরম্ভ । সময়ের সমাজবীক্ষার সঙ্গে নারীর স্তন সম্পর্কে সমাজভাবনারও পরিবর্তন ঘটেছে । আদর্শ স্তন বলতে কেবল তার মাপই নয়, তার আকার, দুই স্তনের মাঝে ফাঁক, ত্বকের রঙ এবং বোঁটার মাপ আর আভার ব্যাপারেও চিন্তার বদল ঘটেছে । একটি বিশেষ সময়ের নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক উদ্বেগ, ভীতি, বিশ্বাস ও ধর্মকর্মও প্রতিফলিত হয়েছে সেই সময়ের আঁকায় আর ভাস্কর্যে ।

পালেওলিথিক আর নিওলিথিক যুগের আঁকা বা ভাস্কর্যে নগ্নিকাদের মাথা ছিল ছোটো কিন্তু স্তন আর পাছার মাপ বিপুল, কেননা সেটাই ছিল আদর্শ নারীদেহ । ফ্যারাওদের সময়ে মিশরে দেবী ও রানিদের স্তন খোলা থাকতো, তাঁদের মাতৃত্ব ও ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কিন্তু তাদের মাপ ছিল ছোটো । টিউরিনের পাপিরাসে পেছন দিক থেকে এক নারীর সঙ্গে সঙ্গমরত পুরুষের ছবিতে দেখানো হয়েছে পুরুষের লিঙ্গের মাপ বড়ো আর নারীর স্তন ছোটো  । প্রাচীন গ্রিসে সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতির মূর্তিগুলোর স্তন বেশ ছোটো । কিন্তু গ্রিসের মূর্তিগুলোও ক্রমশ ঢাকা পড়তে লাগল গায়ের চাদরে । পক্ষান্তরে রোমানরা গড়ে গেছে বড়ো মাপের স্তন ও ছোটো মাপের লিঙ্গ ; রোমান নারীরা বুক বেঁধে রাখতেন ; হয়ত তা থেকেই বডিসের জন্ম । নবম শতকের টাআং রাজত্বেও দেখা গেছে চীনা নারীদের বড়ো মাপের স্তন, যদিও চীনাদের স্তন অপেক্ষাকৃত ছোটো হয় বলে মাপ বৃদ্ধি করার ওষুধপত্র খেতেন ও মাখতেন নারীরা । সে সময়ে চিনের আদর্শ নারীরা ছিলেন বড়ো স্তন, মোটাসোটা আর ভারি পাছার। রাজ দরবারে তাঁরা দুই হাত দিয়ে স্তন ঢেকে রাখতেন । 

নবম থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্যে পার্বতীর মূর্তি আর ছবিতে একেবারে বর্তুল নিটোল স্তন আর উঁচু বোঁটা দেখা যায় । তিনি ছিলেন নারীদেহের নিখুঁত সৌন্দয্যের প্রতিনিধি । দক্ষিণ ভারতে আজও স্তনের মাপ বড়ো করার জন্য শৈশব থেকে টক জিনিস খাওয়ানো হয় আর রাজা রবি বর্মার ক্যালেণ্ডার আর্টে দেবীদের স্তন বড়ো মাপের দেখাবার দরুন তা সমাজে বাহবাযোগ্য হয়ে ওঠে । চিনে সম্রাটের পছন্দ ছিল বড়ো স্তন, তাই তা সৌন্দর্য্যের মাপকাঠি। দক্ষিণ ভারতে মাতৃত্ব আর যৌনতার জন্য স্তনের আকার ছিল মাপকাঠি । সব দেশের সম্রাট চিনের মতন ছিলেন না । ইংল্যাণ্ডে ষষ্ঠ হেনরির আমলে ( ১৪২১ - ১৪৬১ ) নির্দেশ ছিল যে নারীরা তাঁদের বুক এমনভাবে ঢেকে রাখবেন যাতে তা সমতল মনে হয়, কোনো ছবি ও ভাস্কর্যেও সেই নিয়ম মেনে চলতে হতো । রানি প্রথম এলিজাবেথের স্তন ছিল ছোটো, তাই তিনিও বড়ো মাপের স্তন আঁকা বা ভাস্কর্ষে দেখানোকে প্রশ্রয় দেননি । ইউরোপের রেনেসাঁ চিত্রকর্মে বোঁটা মেলে ধরাকে গুরুত্ব দেয়া হতো, এবং স্তনও নানা ধরনের, চিত্রকরের পছন্দ অনুযায়ী । 

স্তনকে ইউরোপের সংরক্ষণশীল মেজাজ যেভাবে তুলে ধরছিল তার তুলনায় জাপানের এডো পর্বে ( ১৬৩০ - ১৮৬৮ ) ‘শুঙ্গা চিত্রাঙ্কনে’ নতুন শৈলী দেখা দিয়েছিল এবং তা স্পষ্ট ইন্দ্রিয়কাতরতার । এই ছবিগুলোতে খোলাখুলি যৌন সম্পর্ক চিত্রায়িত করে হতো । আদর্শ  বলতে বোঝাতো  বেশ বড়ো আর কিছুটা ঝোলা স্তন । তাছাড়া ত্বকের রঙকে দেখানো হতো ফর্সা, বোঁটা ছোট্ট আর গোলাপি, ইউরোপে রেনেসঁসের সময়ের চিত্রগুলোর মতো । সেই সময়ের পুরুষদের কাছে স্তনের পছন্দসই যৌনতার আঁকা ছবিগুলো থেকে টের পাওয়া যায় । সপ্তদশ শতকের ব্রিটেনে মনে করা হতো যে বোঁটা গোলাপি থাকলে মেয়েরা সুস্হ থাকে আর কালো হতে থাকা বোঁটা খারাপ স্বাস্হ্যের লক্ষণ । ২০০৪ সালে ব্রিটেনের রয়াল সোসায়টি এক গবেষণাপত্রে জানায়, বড়ো মাপের স্তনের নারীদের এসট্রাডিওল হরমোন বেশি থাকে যা গর্ভবতী হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে । 

ইউরোপে বারোক পর্বে স্তনকে বাস্তববাদী করে আঁকার চল আরম্ভ হয়েছিল । যেমন রুবেন্স তাঁর ছবিগুলোতে আদর্শ স্তন বাদ দিয়ে বড়ো স্তন এঁকেছেন যা বর্তুল নয় ; বোঁটাও যেমনটা সচরাচর দেখা যায়, তেমনই । সেসব স্তনে খুঁত থাকলেও তা কামোত্তেজক । অবাস্তব কল্পিত স্তন আঁকার চল ক্রমশ বিদায় নিয়ে বাস্তব জগতের স্তন বিভিন্ন ছবিতে দেখা দেয় । উনিশ শতকের ফ্রান্সে স্তন আর বোঁটা হয়ে উঠল কামুকতা আর ইরটিক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু । নগ্নিকাদের নগ্নতাতে স্তন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল বিশ শতকে । পরাবাস্তববাদীরা এবং পিকাসো যোনি ও স্তনকে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিক দিতে লাগলেন, যেগুলো একেবারে ইউনিক যাতে যোনি আর স্তন দেখে চিত্রকরকে চেনা যায় । আধুনিক বক্ষবন্ধনী আবিষ্কার হয়েছিল ১৯১৪ সালে, দুটো রুমালকে বেঁধে পেছনে রিবন দিয়ে আটকে । যেহেতু পুরুষরা বড়ো স্তনে আকৃষ্ট হয়, প্যাডেড ব্রা দেখা দিলো বাজারে । ১৯৪৮ সালে হলিউডের ফ্রেডরিক মেলিঞ্জার আবিষ্কার করলেন ‘পুশ-আপ ব্রা’ যাতে স্তনকে বর্তুল আর প্রকৃত মাপের চেয়ে বড়ো দেখায় । পুশ-আপ ব্রাকে আরেকটু উন্নত করা হলো যাতে ঝোলা স্তনকেও আঁটো মনে হয় আর খাঁজ দেখা যায় । এখন সিলিকন জেলের কাটলেট ব্রাতে ঢুকিয়ে ইচ্ছানুযায়ী ছোটো-বড়ো করা যায় ।

নারীরা কেন স্তনের মাপ বৃদ্ধি করতে চান বা ছোটো স্তনের নারীরা কেন হীনম্মন্যতায় ভোগেন? নিঃসন্দেহে, পুরুষের কামদৃষ্টিতে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য । বস্তুত বড়ো স্তন আর ছোটো স্তনের ভূমিকা একই, তবুও কেন এমনটা হয় ! আগেই লিখেছি যে পালেওলিথিক যুগে, মানে ৩৫,০০০ বছর আগে, বড়ো মাপের স্তনকে গুহাবাসীরা গুরুত্ব দিয়েছে ; অর্থাৎ পুরুষদের পছন্দ ছিল বড়ো মাপের স্তনের নারী । সম্ভাব্য কারণ, বড়ো মাপের স্তনকে মনে করা হতো স্বস্হ্যের লক্ষণ আর সন্তানের জন্য উপযুক্ত । আজকের দিনেও গবেষকরা দেখেছেন যে গরিব ঘরের পুরুষরা অবধারিতভাবে বড়ো মাপের স্তন পছন্দ করেন ।

আরেকটি কারণ হল বিবাহযোগ্য বা প্রতিযোগীতার বাজারে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য স্তনকে বড়ো মাপের করে তোলার ইচ্ছা । ধনীদের বিবাহের আর ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার বাজার সমানভাবে অবারিত নয় । উপযু্ক্ত পুরুষ বাছাই করার জন্য নিজেকে আকর্ষক করে তোলাটা জরুরি, তেমনই ফিল্মস্টার বা মডেলদের জন্য জরুরি বাজারকে দখল করা । ব্যাপারটা বিবর্তনের সঙ্গে জড়িত । পুরুষ যতো ইচ্ছা বাচ্চা পয়দা করতে পারে কিন্তু নারীর হাতে সময় কম, তাই নারীকে গেঁথে তুলতে হয় তার সন্তানের জন্য সবচেয়ে যোগ্য বাবা। বক্তব্যটা সেক্সিস্ট, কিন্তু এটাই সত্যি । কেবল যৌন আকর্ষণের জন্যই নয়, বড়ো মাপের স্তনের নারীকে দেখলে মনে হবে পরিণত, সেই নারী নিজেকেও মনে করবে পরিণত । কোনো নারীই চাইবেন না যে ছোটো মাপের স্তনের কারণে পুরুষেরা তাঁকে মনে করছেন অপ্রাপ্তবয়স্ক । 

আমরা এখন ভোগবাদী সমাজে বাস করি, আর কোনো চাকরি বা কাজের জন্য বুদ্ধিমতী হলেও, শারীরীক আকর্ষণ হল সফলতার একটা সিঁড়ি । সুন্দর মুখমণ্ডলের ও দৈহিক কাঠামোর নারীরা কাজের বাজারে বেশি সুযোগ পান । তবে অত্যন্ত বড়ো মাপের স্তন আবার এক্ষেত্রে ক্ষতিকারক হতে পারে, তখন শল্যচিকিৎসা করিয়ে স্তনের মাপ ছোটো করার পথ ধরতে হবে । এখনকার ফ্যাশানও হয়েছে বড়ো মাপের বর্তুল স্তন আর খাঁজ । পোশাকের ডিজাইনাররা সেইভাবেই সুন্দরীদের উপস্হাপন করেন । অত্যন্ত বড়ো মাপের বা অত্যন্ত ছোটো মাপের স্তন হলে বাজারে ব্রা পাওয়াও কঠিন হয়ে যায় । সিলিব্রিটি সংস্কৃতির জগতে ছোটো মাপের স্তন নারীজগতে ঠাট্টা-ইয়ার্কির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় --- স্তনের মাপ বাড়িয়ে তোলার এও একটা কারণ । খ্যাতি আর জনপ্রিয়তার ভোগবাদী বাজারে স্তন এখন গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র -- শল্যচিকিৎসা নারীকে বহুকাল যৌবন ধরে রাখার সুযোগ করে দিয়েছে । মিডিয়া যেহেতু সেলিব্রিটিদের  রোল মডেল  হিসাবে তুলে ধরে, তরুণীরা তাঁদের পথ অনুকরণ করেন । পর্ন ফিল্মগুলোতে যাঁরা অভিনয় করেন তাঁদের স্তন বেশ বড়ো হয় এবং অনেকে অমন ফিল্মে অভিনয় করার জন্যও স্তনের মাপ অবিশ্বাস্যভাবে বড়ো করে তোলেন । সানফ্রানসিসকোতে বুক-খোলা মেয়েরা জুতো পালিশ করেন, বার-ডান্স করেন বুক খুলে । বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদের জন্য নারীরা বুক খুলে দাঁড়িয়ে পড়েন । স্তনের যৌনতা একই সঙ্গে আক্রমণের অস্ত্র আবার অনুরাগের ডাক দেবার কুহক।


সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২০

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২০

আনন্দ

দেখতেই পাচ্ছেন, আমরা দুই অশীতিপর হাসিমুখে বসে আছি
আমরাও সেটাই দেখছি ।আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না
আমাদের কাঁধ, হাঁটু, কোমরের ব্যথা
কাজের বউ আসছে না, যদিও মাইনে দিতে হয়েছে যাতে না ছেড়ে যায়
যদিবা বাসন মাজি, এমনকী গান গেয়ে, মেরে পিয়া গয়ে রংগুন
ওঁহাসে কিয়া হ্যায় টেলিফুন, তুমহারি ইয়াদ সতাতি হ্যায়
কিংবা কভি আর কভি পার লাগা তিরে নজর
সঁইয়া ঘায়ল কিয়া হ্যায় তুনে মেরা জিগর, কিংবা
জাদুগর সঁইয়া ছোড়ো মোরি বাঁইয়া আবি ঘরি জানে দো
বুড়ি বলে, ভাগ্নে জামায়ের হাতে হাজা হয়ে গেছে
স্যানিটাইজার আর বাসন মাজায় যাও টিভি দ্যাখো
আমি বলি শশীর সুন্দরী বউ অতো বড়ো ফ্ল্যাটের কাজ তো
একাই সামলায়, ওদের দশহাজারি কামওয়ালি চলে গেছে
অগত্যা ফুলঝাড়ু দেবার কাজটা নিয়েছি আর কী আশ্চর্য
এতো পাকাচুল মেঝেতে পড়ে থাকে তা তো বলত না ঝি
ন্যাতাটা গোড়ালি দিয়ে মেঝের ওপর ঘষি, মাটিতে বসতে পারি না যে
বুড়ি রিলাকসিল বা ব্যথার তেল মাখিয়ে দ্যায়, আমি ততোক্ষণ
গান গাই এ গুলবদন এ গুলবদন, ফুলোঁ কি মহক, কাঁটো কি চুভন
তুঝে দেখ কে কহতা হ্যায় মেরা মন, কহিঁ আজ কিসিসে পেয়ার
না হো জায়ে । দেখতে পাচ্ছেন তো আমরা দুই অশীতিপর কীরকম
মজাসসে আছি